আইসোলেশন থেকে লেখা ‌করোনা আক্রান্ত এক পুলিশ সদস্যের চিঠি।

প্রায় এক সপ্তাহ আইসোলেশনে থাকার পর বুঝলাম করোনার আসল ট্রিটমেন্ট টেনশন ফ্রী থাকা!

আইসোলেশন রুমে করোনা পজেটিভ পুলিশ সদস্য রয়েছি তিনজন এসআই মোস্তাফিজুর (সার্ভিস ২৪ বছর), এএসআই সোহাগ (সার্ভিস ১৬ বছর) ও আমি কনস্টেবল স্বাধীন (সার্ভিস ৮ বছর)।

 

গত কয়েকটা দিন খুবই ভালো কাটতেছিলো আমাদের। একেকজনের একেক জায়গায় চাকুরীর অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করি সবসময়। এসআই মোস্তাফিজুর স্যার মোস্ট সিনিয়র ছিলেন। ওনার এতো বছর সর্ভিস জীবনের মজার মজার ঘটনাগুলি ও বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলি আমাদের দুজনের কাছে যখন বলে তখন আমরা দুইজন অবাক হয়ে শুনতে থাকি।

 

গত সন্ধায় খবর আসলো স্যারের পরিবারের বাকি তিন সদস্য (স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ে) করোনা পজেটিভ হয়েছেন। সংবাদটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল মানুষটির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। আমরা দুইজন অনেক চেষ্টা করলাম স্যারকে সাহস দিতে কিন্তু ব্যর্থ হলাম। কারণ এই পরিবারের মানুষগুলোর জন্যই আমাদের এতো হাড়ভাঙা পরিশ্রম, যাদের জন্য সকল কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করে নেই, সেই মানুষগুলোর যখন খারাপ সংবাদ শুনতে পাই তখন আর নিজেকে স্বাভাবিক রাখা যায়না।

 

এশার নামাজ শেষে রাত্রের খাবার খেয়ে ১১ টার দিকে ঘুমাতে গেলাম তিনজন। ঠিক ফজরের আযানের কিছুক্ষণ পূর্বে রুমের ভিতর হটাৎ শ্বাসপ্রশ্বাসের বিকট শব্দ পেলাম। ঘুম ভেঙ্গে গেল আমাদের। দেখি মুস্তাফিজুর স্যারের ভীষণ শ্বাসকষ্ট হচ্ছিলো। তাড়াহুড়া করে আমরা দুজন মাস্ক লাগিয়ে হাতে গ্লাভস পরে স্যারকে ধরে বসালাম। উনি ইশারা করতে পারতেছিলো কিন্তু কথা বলতে পারতেছিলোনা। নার্সকে ফোন করলাম। নার্স দ্রুত একটি পোর্টাবল অক্সিজেন স্যারের মুখে লাগিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক হলেন তিনি।

 

আজ সকালে স্যারকে আইসিইউ ইউনিটে রেফার্ড করা হয়েছে। যাওয়ার সময় স্যারের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো নাহ। একটা আতঙ্ক তাকে ডুবিয়ে রেখেছে। তাই নিজের খারাপ অবস্থার কথাও কিছু মনে হচ্ছেনা। এখন আমরা রুমে দুইজন, কারোর মুখে কোনো কথা নেই।

 

আইসোলেশনে থেকে এতকিছু লেখালেখি করা শুধুই আপনাদের জন্য!

আপনারা যারা বাহিরে ঘোরাঘুরি করতেছেন (প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে) তাঁরা কি একবারো বোঝার চেষ্টা করতেছেন আপনার অসতর্কতার জন্য আপনাদের প্রাণপ্রিয় পরিবারের সদস্যরা কতোটা হুমকির মুখে?

 

জ্বর, সর্দি, কাশি নেই তাই ভাইরাস আক্রান্ত নয় ভেবে যাদের সঙ্গে মিশতেছেন আপনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন সেই মানুষটি করোনা ভাইরাস পজেটিভ নয়?

আমি নিজেই কোনো লক্ষণ ছাড়াই করোনা পজেটিভ হয়ে আছি। এখন পর্যন্ত কোনো রকম লক্ষণ দেখা দেয়নি আমার ও সোহাগ স্যারের।

তাই সাবধান হোন, বাহিরে ঘোরাফেরা থেকে বিরত থাকুন। আর যদি বাহিরে আসতেই হয় আমাদের আইসোলেশন সেন্টার গুলোতে আসুন তাহলেই বুঝবেন করোনার ভয় কাকে বলে।

দয়াকরে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে হলেও আপনি বাড়িতেই অবস্থান করুন।